আমাদের দেশে মার্ক জুকারবার্গ, স্টিভ জবস জন্মায় না কেন?

প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের দেশে মার্ক জুকারবার্গ, স্টিভ জবস জন্মায় না কেন? তাহলে কি আমরা জ্ঞানীর কদর করতে জানিনা? কথায় আছে, যেদেশে গুনীর কদর নেই সেই দেশে তারা জন্মায় না। আমাদের দেশে কদর না থাকলেও তেলা মাথায় তেল দেয়ার লোক নেই, সেটাও মাঝে মাঝে আমার মনে হয় জ্ঞানী না আসার একটা কারন। অথবা কে বলবে তারা হয়ত আসে কিন্তু হারিয়ে যায়?

এই ব্যপারে আমি কথা বলেছিলাম বেশ কয়েকজনের সাথে। তাদের কথা জানবো শেষ দিকে। এই লেখার কিছু উদ্দেশ্য আছে, আশা করি পড়লে বুঝতে পারবেন। আর না বুঝলে কিছু করার থাকবেনা।

অনেকেই বলে আমাদের এডুকেশন সিস্টেমে সমস্যা, অনেকে বলে আমাদের এপ্রোচে সমস্যা, এমন অনেক সমস্যাই বের করা যাবে। তবে সমস্যা চিন্নিত হলেই সমাধান ওখানেই। যেমন, আমরা অনেকেই ইউটিউব এর জাওয়াদ করিম, খান একাডেমীসালমান খান নিয়ে গর্ব করি। প্রশ্ন হচ্ছে ওরা বাংলাদেশ বংশউদ্ভুত ( বাবা মা বাংলাদেশী, জন্ম বাংলাদেশে না ) না হয়ে যদি বাংলাদেশে বড় হত তাহলে কি এমন কিছু করতে পারতো?

আমার ধারনা আমাদের চিন্তা ভাবনায় সমস্যাটা বেশি। যেমন, আমরা যখন ছোট ছিলাম আমাদের ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখানো হত। যখন বড় হলাম তখন চকরির স্বপ্ন। একটা চাকরি যেন অনেক কিছু। চাকরি মানেই নিরাপত্তা। নিরাপত্তাই কি শেষ কথা? যে মানুষ প্রতিদিন অফিস শেষে ২৭ নাম্বার বাসে বাড়ি ফিরে, মাস শেষে ২৫-৩০ হাজার টাকা আয় করে তার কাছে সেটাই কি শেষ? সেটাই নিরাপত্তা? আর কিছু করার নেই? কেন আমাদের অন্য কিছু স্বপ্ন দেখানো হত না? বা আমরাই কেন স্বপ্ন দেখিনা? জব করা খারাপ বলছিনা, তবে জব অনেক কিছু যেমন দেয়, কেড়ে নেয় স্বাধীন চিন্তা ভাবনাও। আবার জব ছাড়া আমাদের উপায়ও বা কি? বৃত্তের বাহিরে কয় জন ভাবতে পারে? কয়জন নিজেকে নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে? আবার কেউ যদি বেরিয়ে না আসে তাহলে স্টিভ জবস , মার্ক জুকারবার্গ, ল্যারি পেজ , সার্জে ব্রিন আসবে কই থেকে? এখন কথা হচ্ছে, বেরিয়ে আসার পরিবেশ আমরা তৈরী করতে পেরেছি? আমি মোটামুটি কনভিন্সড, আমরা পারিনি।
ফেসবুকের কারনে অনেকেই অনেক কিছু দেখার সুযোগ হয়েছে, তবে কোথাও দেখিনি সেই প্রজেক্টকে উতসাহ দেয়া বা ইনভেস্টমেন্ট করে কিছু করা। গতবছর ন্যাশনাল হ্যাকাথন হয়। সেখানে ১০ টি সমস্যা সমাধানের জন্য ৩০টি অ্যাপ্লিকেশনকে পুরষ্কিত করা হয়। নিঃসন্দেহে চমৎকার উদ্দ্যেগ। কথা হল, সেই সমাধানগুলোর একটাও কি প্রয়োগ পেয়েছে? বা পাবে? সেগুলা প্রয়োগ করানোর জন্য কেউ কি কিছু করছে?
ইন্ডিয়া থেকে শুরু করে বড় বড় দেশগুলোতে ভার্সিটি লেভেল থেকেই শুরু হয় নতুন কিছু করার আনন্দ। প্রজেক্ট তৈরী, ক্রিয়েটিভ কিছু। আর আমাদের সিস্টেম এমন, আমরা কোন মতে পাশ করে বের হতে পারলেই হল। আমাদের পরিবেশটা যেন প্রস্তুত না। আমার ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান কিছুটা মনক্ষুন্ন হয়েছিলেন একদিন এসব তুলে ধরায়। আসলে সব কিছু এত বানিজ্যিক সেখানে অন্য কিছু ভাবার সুযোগ কই? শিক্ষায় ভ্যাট বসিয়ে সেটাকে পন্যের কাতারে নামিয়ে আনা হয়েছে, সে জায়গায় ভার্সিটির কেউ ঝামেলা নিয়ে অন্য কিছু করার চিন্তা করবেই বা কেন? তবে, ব্যতিক্রম অবশ্যই থাকবে।
একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে, এমন আশায় একটা সিনারিও চিন্তা করেন আমাদের দেশে। ধরেন আপনি একটা প্রজেক্ট চিন্তা করলেন। বাস্তবায়নের জন্য অর্থ দরকার। এখন আপনি ইনভেস্টর পেলেন। ধরেন সে মতিঝিল থাকে আপনি উত্তরায়। বলেন তো এখন আপনার মাথায় কি আসবে? মিটিং করতে গেলে নির্ঘাত রাস্তায় ৩ ঘন্টা যাবে! আসতে ৩ ঘন্টা। রাস্তায় বের হয়ে বাস পাবেন কিনা তাও সন্দেহের ব্যপার। তারপর সে আপনার আইডিয়া শুনে হয়ত আপনাকে বলবে, “কি সব ছাতা মাথা নিয়ে আসছো?” পরে সে ঐ প্রজেক্ট নিজে করে নিলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমাদের নৈতিকতায় সমস্যা আছে এটা নতুন কিছু না। এরপর যদি শুরুও করেন মার্কেট রিসার্চ, প্ল্যানিং, অ্যাপ্লিকেশন সব জায়গায় আপনাকে বাধা পেতে হবে। বিটিসিএল ! এ একটা ডিএনএস নাম চেঞ্জ করাতে ৩ দিন লাগে, যেটা পাঁচ মিনিটের কাজ! তাহলে আমাদের কাজ আগাবে কিভাবে? বলতে পারেন যে করবে তার জন্য এসব চ্যালেঞ্জ সয্য করতে হবে। হ্যা, মেনে নিলাম চ্যালেঞ্জ, কিন্তু এমন অসংখ্য ছোট ছোট চ্যালেঞ্জ ফেস করতে করতে বয়স যাবে, পেটে মেদ হবে, প্রতিবেশি আত্তীয়দের কথা শুনতে হবে। সেওতো মানুষ, সব কি ইগ্নোর করা যায়? আর সবচেয়ে বড় কথা, আমরা উপরে উঠার চেষ্টা করিনা। কেউ উপরে উঠতে গেলে চার পাশে আমরাই তাকে টেনে নামায়ে ফেলি। আমাদের এই মেন্টালিটির পরিবর্তন কি আসবে কোনদিন?

ছোট্ট একটা উদাহরন, আমরা যারা কম্পিউটার সায়েন্স পড়ি, তারা ৪০/৪৫টা সাজবেক্ট পড়ি। প্রচুর জিনিসের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু আমরা ভার্সিটিতে থাকতে পাশ এর চিন্তা বের হয়ে ওয়ার্ডপ্রেসের থিম এডিট করে কিংবা এইচটি এমএল – সিএসএস সাইট বানিয়ে কিছু টাকা পয়সা কামিয়ে ভাবি এই তো জীবন! আরো বড় সমস্যা হচ্ছে যারা এমন করছে তাদের এত বেশি তেল মারা হয় তারা ভাবে তাদের কাজ এখানেই শেষ! এভাবেই চলা যায়। আসলেই চলা যায়।  অ্যালগোরিদম ব্যবহার, নতুন সিস্টেম ডিজাইন, প্রব্লেম থেকে কিছু একটার সলুউশান করে সেটা মানুষের মাঝে নিয়ে আসার সময় কই আমাদের? অথবা সেটা যে করতে হবে তা কি কেউ আমাদের বলছে? আমরা তো সব শিখে জন্মাইনি!

আমার এক বন্ধু বলে, তুমি যদি এই দেশে কিছু বানাও তাহলে এইটা নিউজ হবে কই? চ্যানেল আই? বিটিভি? সেগুলা কেউ দেখে? আসলেই! আমরা কেউ খেলা নিয়ে বিজি, কেউ ইন্ডিয়ান কুটনামি সিরিয়াল। আর বাহিরে বানালে? বিবিসি, সিএনএন! এর মানে দেশ ছাড়তে হবে তা বলিনা, তাহলে কোন দিন পরিবর্তন আসবেনা, বরং নিজেদের পরিবেশ ঐভাবে তৈরী করতে হবে। তার জন্যই এই লেখা।

সুন্দর পিচাই গুগলের সিইও হওয়ার পরে অনেক কথাই বলছে। ভারতের মত শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা কি তৈরী করতে পেরেছি? পারলে সুন্দর পিচাই এর পথ ধরে আমরা আগাই, তাকে নিয়ে তেনা কম পেছানোই শ্রেয়। তবে সে অনুপ্রেরণা বটে। আরেকট ব্যপার খেয়াল করেন, ওয়েবে সফলতম সাইট/প্রতিষ্ঠান/ব্যবসার দিকে ইন্ডিয়ানরা প্রচুর এগিয়ে। গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল, মাইক্রোসফট এগুলার পরে মাঝারি, বড় যত অনলাইন বেইজড বিজনেস আছে তার সিংহভাগ ইন্ডিয়ানদের দখলে। আমারা পারছিনা কেন?

আমি কয়েকজনকে প্রশ্ন করেছিলাম, কেন আমাদের দেশে জ্ঞানী গুনি তৈরী হয়না? দেখি চলুন, তারা কি বলে?

”  আমাদের দেশে মেধাবী শিক্ষার্থী কিন্ত কম নেই। গুগলে ডজন খানেক বাংলাদেশী চাকুরি করছে।  বাংলাদেশে লিপু কথা মনে আছে? দেশে সম্মান এবং কাজের পরিবেশ না পেয়েছে আমেরিকায় চলে গেছে। সেখানে গাড়ি বানাচ্ছে। ন্যাশনাল জিওগাফি চ্যানের লিপুকে নিয়ে সিরিজ হয়। অথচ আমাদের মিডিয়া যেন লিপুকে চিনে না। এটা উদাহরন মাত্র। এমন অনেকেই আছে।  আমার গুনী সম্মান করি না। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলি। তাই তো দেশে কেউ থাকতে চায় না। সবাই বিদেশে পারি জমায়। নতুন উদ্দ্যাগ শুরু করার জন্য পযান্ত পরিমানে ফান্ড পায় না, পায় না বিনয়োগ। আর আমার রিস্ক নিতে চাই না। এটাই একটা বড় কারণ হতে পারে। ” -তুসিন আহমেদ

 

“কারন আমরা আইডিয়া এর পিছনে টাইম দেইনা বা প্রয়োজন মনে করিনা। ব্যসিক্যালি আপনি যখন তাদের ( স্টিভ জবস, মার্ক জুকার্বার্গ ) ইতিহাস পড়বেন দেখবেন তারা অনেকবার ফেইল হয়েছে আইডিয়া ইমপ্লিমেন্ট করতে গিয়ে কিন্তু ওখানেই থেমে যায়নি, কিন্তু আমরা থেমে যাই। আরো একটা ব্যপার, তারা অন্যে কি করসে ওইটা দেখে সেইটা করতে হবে এমন ধারনা কোনদিন করতেন না। বরং উনারা যা করছে আমরা এখন সেটাই ফলো করি। আমাদের মধ্যে ঐ জিনিস নাই যে আমরা যা করবো সেটা ইতিহাস হবে। আরো একটা কারন, আমাদের কোন ভিশন নেই। এখন কি চলতেসে বিজনেস বেশি সেটাই করবো। ওকে, ই-কমার্স চলতেসে তাহলে এর একটা বিজনেস খুলে বসি, ইনকাম ভালো হবে। এভাবে তো স্টিভ জবস হওয়া যায়না!  স্টিভ জবস হতে হলে আইডিয়া যেমন ইউনিক হতে হবে তেমনি সেটা ইমপ্লিমেন্ট এর জন্য থাকতে হবে স্কিল, ব্রেইন আর কমিটমেন্ট। অন্যকে দেখে অনুকরন নয়, বরং নিজেই কিছু করার ডিজায়ার থাকতে হবে। ” – শুভ্র পাল

 

“জন্মায় কিন্তু আমরা তাদের খুন করে ফেলি। এবং আমরা তাদের কদর করতে জানিনা। আরো কিছু কারন, যেমনঃ
১।  আমাদের বাবা-মা খুব ই ভীতু। তারা তাদের সন্তানকে কখনো ঝুঁকি নিতে দেয়না । আর ঝুঁকি ছাড়া কিভাবে উদ্যোক্তা হবে?
২। আমরা এক হতে শিখিনি। আর বড় কিছু করতে গেলে অনেকে এক তথা ঐক্যে আসা প্রয়োজন।
৩। আমরা হীনমন্যতায় ভোগি। ” – আনিসুজ্জামান বাবলা

 

” ১/ রাজনৈতিক অস্তিরতা।
২/ আমাদের সমাজে ইউনিক পথে গেলেই ঝামেলা।
৩/ আপনি স্রোতের বিপরীতে গা ভাসাতে পারবেন নাহ।
৪/ বাইরের লোক তও দুরে।
৫/ নিজের ফ্যমিলি থেকেও সাপোর্ট পাবেন নাহ। ” – দেবাশীষ দাস

 

“আমাদের এডিকেশন সিস্টেম, প্রসেসে সমস্যা। স্কোপ কম। নিউট্রিশান সমস্যা, ছোটবেলা থেকে আমরা ঐভাবে এসব পাইনা, ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট কম হয়। ” – আসাদুজ্জামান নাঈম

 

” আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় শত্রু হল আমাদের আত্বীয়। হাসবেননা, এটাই সত্যি। আমরা জীবন যুদ্ধে পরাজিত হলে এরা এসে আপনাদের বাড়িতে চা নাস্তা খাবে, এরপর ইন্ডাইরেক্টলি আপনাকে হেনস্তা করবে। আর আপনি, ভদ্রতা বশত: হ্যা! হু! করা ছাড়া কিছুই করতে পারবেননা।” – জান্নাত পিউ

 

” আমারা ব্যর্থ হতে শিখিনি। অনেক ব্যর্থতার পিছনেই যে সফলতা থাকে তা আমাদের কল্পনাতীত। আমাদের জীবনের লড়াই শুধু বেচে থাকার জন্য। সমাজ-রাষ্ট্র-পৃথিবীকে যে আমরা পরিবরতন করতে পারি তা আমাদের চিন্তাতেই আসে না। তাইতো দেখবেন নিজের অবস্থান ঠিক রাখার জন্য একজন ব্যক্তি দেশের সর্বোচ্চ আসনগুলোতে বসেও সেচ্ছায় দেশের ক্ষতি করছে।

তবে আমি বিলিভ করি যে কেউ যদি নিজের উপর আস্থা রেখে ব্যর্থ হওয়ার পরও লড়ে যায় তাহলে সকল বাধা পেড়িয়ে জায়গাতে পৌছাতে পারবে।” – নাসির বিন বুরহান

 
সমাধান কি?
– সৃষ্টির আনন্দ বুঝতে শেখানো।
– পরিবেশ তৈরী করা।
– ইন্ডাস্ট্রিগুলার মধ্যে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। যেমন, যে যেই সেক্টরে কাজ করে সেখানে সবার মধ্যে ভালো সম্পর্ক, পরিবেশ তৈরী করা দেশ জুড়ে। জ্ঞান বিনিয়ম, ইফেক্টিভ কম্পিটিশান। নতুন প্রডাক্ট বানিয়ে সেগুলা জাতীয় পর্যায়ে ছাড়া। প্রযুক্তি নিয়ে আসা।
– সরকারী পর্যায় থেকে ট্রান্সপারেন্ট ওয়েতে অর্থায়ন, এবং ক্রিয়েটিভ প্রজেক্টগুলো তুলে আনতে হবে।
– আমাদের নিজের মেন্টালিটিটা একটু চেঞ্জ করার চেষ্টা করতে হবে। নিজে ভালো করতে না পারি, কেউ কিছু করলে যাতে তার ভালোটা এডমিট করে নেয়ার ক্ষমতা আমাদের জন্মায়।

 

ভালো থাকবেন সবাই।

 

আরো পড়ুনঃ লোকাল কাজ করলে কি কি সমস্যায় পড়তে হয়?

Mosharrof Rubel

আমাকে ফেসবুকে পাবেন এখানেঃ মোশাররফ রুবেল

You may also like...

Leave a Reply