মোবাইল অ্যাপের ডেভেলপমেন্ট রেট এবং আমাদের দেশী ক্লায়েন্ট/ কোম্পানি ( পর্ব এক )

( লেখকঃ শুভ্র পাল। ফাউন্ডার , WizardApps )

একটি মোবাইল অ্যাপের ডেভেলপমেন্ট রেট কেমন হওয়া উচিত সেটা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে একজন ডেভেলপারের স্কিল এবং অ্যাপের কার্যকারিতার উপর। একটি অ্যাপকে তার কার্যকারিতার উপর নির্ভর করে Low, Mid এবং High ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা যায়। ঠিক একইভাবে একজন ডেভেলপারের স্কিলকে তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে Low, Mid এবং High ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা যায়।

 

একটি Low ক্যাটাগরির অ্যাপের জন্য একজন কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ডেভেলপার যেমন তার সম্মানীকে 5-10K রেঞ্জে চিন্তা করতে পারেন তেমনি একই অ্যাপের জন্য একজন বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ডেভেলপার তার সম্মানীকে >30K রেঞ্জে চিন্তা করতে পারেন। দুজন ডেভেলপারই তাদের নিজস্ব অবস্থানে সম্পূর্ণ সঠিক হলেও আমাদের দেশের খুব কম কোম্পানি/ক্লায়েন্ট আছেন যারা এই পার্থক্য কে ধরতে পারেন এবং একজন ডেভেলপারকে তার সঠিক সম্মানী দেয়ার কথা চিন্তা করতে পারেন।

mobile apps development cost bangladesh

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা এই দুজনকে সমপর্যায়ের ডেভেলপার ভাবেন এবং তাদের চিন্তা-ভাবনাকে ওই 5-10K রেঞ্জেই সীমাবদ্ধ রাখেন। অপ্রিয় হলেও সত্য, ঠিক এই কারনে আমাদের দেশ থেকে এখনও বিলিয়ন বা মিলিয়ন ডলারের অ্যাপ তৈরি হচ্ছেনা কারন যতক্ষন না পর্যন্ত একজন ডেভেলপার তার কাজে স্বাধীনভাবে মাথা খাটাতে না পারবেন এবং কাজটিকে নিজের কাছে ভালো লাগাতে না পারবেন ততক্ষন পর্যন্ত কাজটিতে বৈচিত্র্য আসবেনা বা আর পাঁচটা কাজের চেয়ে আলাদা কিছু হবেনা। কিন্তু ওই 5-10K রেঞ্জ দিয়ে আপনি একজন ডেভেলপারের কাছ থেকে আর কি বা আশা
করতে পারেন। মূলত এই কারনেই আমাদের দেশ থেকে দায় সারা গোছের অ্যাপ দিয়েই প্লেষ্টোর ভর্তি যা মূলত কোন কাজের না বা সৃষ্টিশীল কিছুনা। 50K ডাউনলোডই আমাদের কাছে স্বপ্নের মত!

এবার আসি একটি অ্যাপ করতে গিয়ে ডেভেলপার এবং কোম্পানি/ক্লায়েন্ট এর পারস্পারিক দ্বন্দ্বের ব্যাপারটিতে। বেশি দূরে যাবনা, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং চীনের অভ্যন্তরীণ  অ্যাপ মার্কেট কতটা শক্তিশালী আশা করি কম বেশি সবাই তা জানেন। ওখানকার অ্যাপ ডেভেলপারদের প্লেষ্টোর থেকে উপার্জনের উপরে নির্ভর করতে হয়না, নিজ দেশের ক্লায়েন্ট/ কোম্পানি তাদেরকে যোগ্য সম্মানী দেয়, আর একারনে তাদের রয়েছে “WeChat” বা “Spartan Wars” এর মত ওয়ার্ল্ড ক্লাস অ্যাপ।

দুঃখের বিষয় নাম করা কিছু ভালো কোম্পানি ছাড়া আমাদের দেশের অধিকাংশ কোম্পানি/ ক্লায়েন্ট দের টপ ম্যানেজমেন্ট টেকনোলজিকাল টার্মগুলোতে অতোটা অ্যাডভান্সড নন, এমনকি অনেকেই কোডিং কি জিনিস, কিভাবে তা করে সেটাও বোঝেন না। টাকা আছে বলেই এই লাইন থেকে আরও টাকা কামানো যাবে এমন হাস্যকর চিন্তা করে নেমে পরেন!

তাই প্রথমেই তাদের উদ্দেশ্য করে বলছিঃ

১। সফটওয়্যার বিজনেস শুরু করার আগে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট লাইফ সাইকেল এবং সফটওয়্যার বিজনেস ও মার্কেটিং প্লান সম্পর্কে খুব ভালো ধারনা নিয়ে এ লাইনে আসুন। কোম্পানি দিলেই কোটি কোটি টাকা ইনকাম করা যায় এ জাতীয় ধারণা থাকলে বলব আপনার জন্য এ লাইন না। মূলত এ ধরনের ভিত্তিহীন ধারণার কারনেই আমাদের দেশে এখনও নাম করা কোন স্টার্টআপ হয়নি বা হয়না। মনে রাখবেন গুগল, অ্যাপল, ফেসবুক, মাইক্রোসফট একদিনে হয়নি।

২। একটি অ্যাপ করার আগে কি করতে চান সেটা নিয়ে খুব ভালো করে ভাবুন, ডেভেলপারের সাথে বসুন, তাকেও ভাবতে সময় দিন। আপনার অবাস্তব কোন চিন্তাকে ডেভেলপারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিবেননা। কারন একজন ডেভেলপার আপনার খায়েশ মেটানোর কোন বিষয়বস্তু নন। আর যাই হক একজন প্রকৃত ডেভেলপার শুধুই টাকার জন্য কাজ করেননা, তাই তাকে টাকা দিলেই সে যে কোন কাজ করতে বাধ্য এ ধরনের চিন্তা করাটা ভুল।

৩। ডেভেলপার কাজ শুরু করার আগেই তাকে জানিয়ে দিন আপনার অ্যাপের ডিজাইন কি হবে এবং কি কি ফিচার থাকবে। কারন তখন একজন ডেভেলপার আপনার কাজটি সম্পর্কে পরিষ্কার একটি ধারনা পান এবং বুঝতেও পারেন কিভাবে সাজিয়ে কাজটি করা সম্ভব। কাজ শুরু করার পরে অমুক কালার টা ভালো হয় নাই, অমুক ফিচারটা অ্যাড করেন এ ধরনের কথা বলবেন না, এতে ওভারঅল অ্যাপের কোয়ালিটি নেমে যায়। ফিচার অ্যাড করার প্রয়োজন হলে পরবর্তী ভার্সনে তা অ্যাড করুন। ডেভেলপারকে এমনভাবে কোডিং করার নির্দেশনা দিন যেন পরবর্তীতে নতুন ফিচার অ্যাড করতে কোন সমস্যা নাহয়।

৪। কাজ সম্পর্কে কথাবার্তা চূড়ান্ত হওয়ার পরে একজন ডেভেলপারকে যে কাজটি করতে দিচ্ছেন কাজ শুরু করার পরে সেই কথাগুলো মেনে চলুন। শুরুতে কথা না হয়ে থাকলে কাজ চলাকালীন সময়ে একজন অ্যান্ড্রয়েড ডেভেলপারকে হুট করেই সার্ভার সাইডের কাজ বা ফটোশপে ডিজাইনের কাজ করতে বলবেন না। কারন আপনার কাছে ওগুলো “জাস্ট কোডিং” বা “এইটুকু কাজ করতে পারবেনা তাহলে কি রকমের ডেভেলপার” এ জাতীয় কথা মনে হতে পারে কিন্তু ওই ডেভেলপার শুধু ফ্রন্টএন্ড এক্সপার্ট হতে পারেন। তারপরও যদি আপনার এ ধরনের কথাই মনে হতে থাকে তাহলে বুঝে নিন সফটওয়্যার বিজনেস আপনার দ্বারা সম্ভবনা।

৫। কাজ শুরু করার প্রথমেই “টাকা কম দিব” বা “আমার বাজেট খুব কম” বা “এ কাজটা ২ দিনেই করে দিতে হবে” এ ধরনের কথা থেকে বিরত থাকুন। ডেভেলপারকে একটি অ্যাপ করতে ২/৪ হাজার টাকা দিবেন এমন চিন্তা করা থেকে বিরত থাকুন। সরকারী অফিসগুলোতে শুধু আপনার ফাইলগুলোকে নাড়ানোর জন্য কেউ কোন কষ্ট না করলেও আপনি লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিতে পারেন, কিন্তু একজন ডেভেলপারকে তার প্রানান্ত প্রচেষ্টার জন্য যোগ্য সম্মানীটুকু আপনি দিতে পারেননা! একটু চিন্তা করে দেখুন, আমাদের দেশী ডেভেলপাররা যদি অ্যাপ ডেভেলপ না করতেন তাহলে একজন বিদেশী ডেভেলপারকে দিয়ে আপনার অ্যাপটি ডেভেলপ করাতে কত খরচ করতে হত আপনার?

আপনার মূলধন কম থাকলে আপনার বিজনেস প্লান পরিবর্তন করুন, শেয়ারের ভিত্তিতে ডেভেলপারের সাথে চুক্তিতে কাজ শুরু করুন এবং চুক্তির নিয়মগুলো মেনে চলুন। অ্যাপ করার জন্য আপনার হাতে সময় কম থাকলে ডেভেলপারকে তা ভালোভাবে বুঝিয়ে বলুন, কম সময়ে অ্যাপ ডেলিভারি দেয়ার জন্য ডেভেলপারকে অতিরিক্ত সম্মানী দিতে আগ্রহী হন।

৬। একজন ডেভেলপারকে তার প্রকৃত মর্যাদা দিতে শিখুন, কেমন মর্যাদা দিবেন বুঝতে না পারলে দেশের বাইরে একজন সফটওয়্যার ডেভেলপারকে কেমন মর্যাদা দেয়া হয় সেটা জেনে নিতে পারেন। মনে রাখবেন একজন ডেভেলপার আপনার অফিসের কেরানী নন যে আপনি যখন যা বলবেন তা করতে তিনি বাধ্য।

৭। কাজ হয়ে যাওয়ার পরে যত দ্রুত সম্ভব ডেভেলপারকে তার প্রাপ্য সম্মানী পরিশোধ করুন। আমাদের দেশে বিভিন্ন ক্লায়েন্ট/কোম্পানিদের কাছে হয়ে যাওয়া কাজের বিভিন্ন খুদ খুঁজে বের করে ডেভেলপারের প্রাপ্য টাকা পরিশোধ না করা, অর্ধেক পরিশোধ করা বা পরিশোধ করা নিয়ে সময়ক্ষেপণ করার মত হীন কাজগুলো বেশ জনপ্রিয়। আমি বলব এ ক্ষেত্রে আপনাদের সফটওয়্যার বিজনেস না করে মাছের বিজনেস করা উচিত! একটা কথা এ ক্ষেত্রে মনে রাখবেন, আমাদের দেশের ডেভেলপার নেটওয়ার্কটা খুব ছোট, তাই কোন ক্লায়েন্ট/কোম্পানি এ ধরনের কাজ করছে তা কিন্তু কমবেশি সবারই জানা। এভাবে চালাতে থাকলে কিছুদিন পরে আপনার কাজ করে দেবার মত আর কোন ডেভেলপার খুঁজে পাবেননা।

৮। এতকিছুর পরেও যদি আপনার মনে হয় ডেভেলপার হওয়া এমন কঠিন আর কি, বা ডেভেলপাররা কাজ করে কোথায় সারাদিনতো ফেসবুকে বসে থাকে বা গল্প/আড্ডা মারে তাহলে পিসি বা ল্যাপটপটা নিয়ে বসে পড়ুন, ব্যাকএন্ড কোডিং এর প্রয়োজন নেই, শুধু আপনার মোবাইলে থাকা যে কোন ১টি অ্যাপের প্রথম পেজটা ডিভাইস ইন্ডিপেন্ডেন্সি মেনে ডিজাইন করুন। আশা করি বুঝে যাবেন ডেভেলপার কারা এবং চাইলেই সবাই কেন ডেভেলপার হতে পারেনা!

 

আরো পড়ুনঃ ক্যারিয়ার হিসেবে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট।

Mosharrof Rubel

আমাকে ফেসবুকে পাবেন এখানেঃ মোশাররফ রুবেল

You may also like...

Leave a Reply